১.

যখনই পহেলা বৈশাখ উদযাপন কিংবা বাঙ্গালি সংস্কৃতির বর্তমান রূপকে প্রত্যাখ্যান করার কথা বলা হয়, অমনি একটা প্রশ্ন ধেয়ে আসে: 'তাহলে আপনাদের বিকল্প কী? মুসলিমরা কালচার করবে কীভাবে? তাঁদের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড কী হবে?'

শুনতে প্রশ্নটা যৌক্তিক মনে হয়। কিন্তু খোদ প্রশ্নটার ভেতরে একটা ফাঁদ আছে। এখানে শুরুতেই সংস্কৃতির একটা নির্দিষ্ট সংজ্ঞা ধরে নেয়া হয়েছে।

এই প্রশ্ন ধরেই নিয়েছে যে, সংস্কৃতি মানে হলো একগুচ্ছ বিশেষ দিন, উৎসবের ক্যালেন্ডার, জনপরিসরে প্রদর্শন, জাঁকজমক—অর্থাৎ এমন কিছু যা আপনি পালন করবেন বা পারফর্ম করবেন।

আপনি যদি একবার সংস্কৃতির এই ছককে মেনে নেন, তবে শুরুতেই আপনি হেরে গেলেন। এখন আপনার সব শক্তি খরচ হবে 'বাঙ্গালিয়ানার' নিম্নমানের কপি তৈরিতে, নতুবা এমন সব কার্যক্রম খুঁজে বের করতে যার কোনো ভিত্তি দ্বীনের মধ্যে নেই, অথবা যা ইসলামের বিধিবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক।

গতো কয়েক বছরে একুশে ফেব্রুয়ারিতে 'শহীদ মিনারে' ফাতিহা পাঠ, রমাদ্বান 'উদযাপনের' নামে গান-বাজনা ও ফ্রি-মিক্সিং, ইসলামী সংস্কৃতির নামে কনসার্টের আদলে কাওয়ালী সন্ধ্যা আয়োজন, "ইসলামী কায়দায়" নববর্ষ পালন—এধরনের চিন্তার ফলাফল।

মুসলিমদের সংস্কৃতি কী হবে এই প্রশ্নের উত্তরের আগে প্রশ্নটার ব্যবচ্ছেদ জরুরি। আর সেই ব্যবচ্ছেদের আগে আরও মৌলিক একটা কথা চিন্তা করা দরকার:

'সংস্কৃতি' শব্দটার প্রকৃত অর্থ আসলে কী?


২.

মুসলিমরা কালচার করবে কীভাবে?—এই প্রশ্নের গভীরে সংস্কৃতির প্রদর্শননির্ভর সংজ্ঞা লুকানো আছে (Culture as spectacle)। সংস্কৃতি হলো গান, নাচ, শোভাযাত্রা, সম্মিলিত উদযাপন, উৎসব—অর্থাৎ এমন সব কর্মকাণ্ড যা একটি জনগোষ্ঠীকে দৃশ্যমান করে তোলে। একে আমরা 'নান্দনিক-প্রদর্শনবাদী' (Aesthetic-performative) সংজ্ঞা বলতে পারি।

এটা কোনো নিরপেক্ষ বা সর্বজনীন সংজ্ঞা না।

সংস্কৃতির আরও মৌলিক সংজ্ঞা হলো: সংস্কৃতি হলো সেই সামগ্রিক জীবনাচার, যার মাধ্যমে একটি সমাজ তার মূল্যবোধ, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং অস্তিত্বের দিশাকে পুনরুৎপাদন করে।

কোনো বিশেষ দিনে মানুষ কী প্রদর্শন বা উদযাপন করছে তারচেয়ে বরং বড় কথা হলো তারা কীভাবে তাদের সন্তানদের বড় করছে, জীবনকে কিভাবে সাজাচ্ছে, লেনদেন কীভাবে পরিচালনা করছে, জীবন ও মৃত্যুকে কীভাবে গ্রহণ করছে, জ্ঞানের অন্বেষণ কীভাবে করছে, ক্ষমতার চর্চা কীভাবে করছে, আগন্তুকের সাথে ব্যবহার কেমন হচ্ছে ইত্যাদি।

সংস্কৃতি এমন কিছু না যেখানে আপনি হাজিরা দেন বা উপস্থিতি নিশ্চিত করেন। সংস্কৃতি হলো তা—যা আপনি 'স্বয়ং'। সংস্কৃতি হলো আপনার সমাজ, আপনার কওম যা তার সাধারণ দৈনন্দিন জীবনে নিরবচ্ছিন্নভাবে করে যাচ্ছে।

এটা হালকা উপরিস্তর মাত্র; যা গভীরতর বাস্তবতার দৃশ্যমান বহিঃপ্রকাশ। একটা উৎসব কেন তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে? একটা শোভাযাত্রা কেন মানুষের মনে আবেগ জাগায়? কেন কোনো সম্মিলিত উদযাপন মানুষকে স্রেফ বিনোদন দেওয়ার বদলে একসূত্রে গেঁথে ফেলে? প্রদর্শনবাদী সংজ্ঞা এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না। কারণ উত্তরগুলো থাকে সেই প্রদর্শনীর অন্তরালে।

একটা উৎসব তখনই অর্থবহ হয় যখন তা কোনো কিছুর দিকে ইশারা করে। সেটা হতে পারে যৌথ মূল্যবোধ, সামষ্টিক স্মৃতি, কিংবা 'আমরা কে এবং কোথায় যাচ্ছি' তার একটা বয়ান।

এই বিষয়গুলো সরিয়ে ফেললে যা বাকি থাকে সেটা স্রেফ বিনোদন। প্রদর্শন বা উৎসব সবসময়ই দ্বিতীয় পর্যায়ের বিষয়; এটি সবসময় নিজের গভীরে থাকা কোনো সত্যের দিকেই নির্দেশ করে।

এর মানে হলো, আপনি যদি কোনো সংস্কৃতিকে বুঝতে চান, তবে 'উৎসব' হবে তাকে দেখার জন্য সবচেয়ে শেষ জায়গা। কারণ উৎসব হলো সবচেয়ে কৃত্রিম, সবচেয়ে পারফর্মেটিভ এবং সচেতন প্রকাশ। সংস্কৃতিকে দেখার প্রথম জায়গা হওয়া উচিত মানুষের পরিবার, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জন্ম ও মৃত্যুর সময়কার বাস্তবতা।

প্রদর্শননির্ভর সংজ্ঞা একটা সেকেন্ড-অর্ডার ফেনোমেননকে মূল হিসেবে ধরে নেয়।

সংস্কৃতির প্রদর্শননির্ভর এই সংজ্ঞার পেছনে একটা রাজনৈতিক ইতিহাস আছে।

উপনিবেশিক প্রশাসকদের প্রয়োজন ছিল তাদের শাসিত জনগোষ্ঠীকে শ্রেণিবদ্ধ করা এবং নিয়ন্ত্রণ করা। তারা চেয়েছিল সংস্কৃতি এমন কিছু হোক যা সহজে পর্যবেক্ষণ ও নথিভুক্ত করা যায়, যার জন্য ফান্ড দেওয়া যায় এবং যা 'ঝুঁকিমুক্ত'।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে লোকজ নাচ সংরক্ষণ করা যেতে পারে। ধর্মীয় উৎসবে অনুমতি দেওয়া যেতে পারে, এমনকি পৃষ্ঠপোষকতাও হতে পারে। কিন্তু একটা জীবন্ত সভ্যতা—যার নিজস্ব আইন, জ্ঞানতত্ত্ব (Epistemology) আর প্রতিষ্ঠান আছে; যার এমন এক ব্যবস্থা আছে যা উপনিবেশিক রাষ্ট্রের মুখাপেক্ষী না হয়েও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব তৈরি করতে সক্ষম—তা সহ্য করা যায় না।

তাই উপনিবেশিক কাঠামো সচেতনভাবেই সংস্কৃতিকে তার আলঙ্কারিক আবরণ প্রদর্শননির্ভর সীমানায় সীমিত করে ফেলে। যেখানে কেবল টোকেন ঐতিহ্য, পারফরম্যান্স আর উৎসব থাকে। আইন, অর্থনীতি, শিক্ষা আর রাজনৈতিক জীবন থেকে একে সচেতনভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হলো।

উপনিবেশিক আমল শেষ হওয়ার পর ইউনেস্কো, দাতা সংস্থা আর এনজিওগুলোর হাত ধরে সংস্কৃতির এই ধারণা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেল। সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়ায় কেবল 'উৎসব', প্রদর্শন। এমন কিছু যা সংরক্ষণ করতে হবে। এমন কিছু যা পারফর্ম করতে হবে। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—এমন কিছু যা ক্ষমতার কাঠামোকে কোনোভাবেই চ্যালেঞ্জ করবে না।

'মুসলিমরা কালচার করবে কিভাবে?'—এই প্রশ্নটা পুরোপুরি এই কাঠামোর ভেতর থেকেই করা হয়। তাদের দেওয়া শর্তে উত্তর দেওয়া মানেই হলো এই কাঠামোকেই চূড়ান্ত বলে স্বীকার করে নেওয়া।

আমরা এই কাঠামোকে প্রত্যাখ্যান করি।


৩.

এবার সঠিক সংজ্ঞার জায়গা থেকে চিন্তা করা যাক। ইসলামের কি নিজস্ব কোনো সংস্কৃতি আছে?

পাঁচ ওয়াক্ত সালাত মানুষের পুরো দিনকে কাঠামো দেয়। জুমার পুরো সপ্তাহকে বিন্যাস্ত করে, ব্যক্তিকে ক্রমাগত তার কমিউনিটির মধ্যে গেঁথে রাখে। রমাদ্বান মানুষের ঘুম, পানাহার, সামাজিকতা আর মানসিক অবস্থাকে বদলে দেয়। ইসলামী বিধান জন্ম, নিকাহ আর মৃত্যুর মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোকে বিশেষ কিছু সামাজিক দায়বদ্ধতার মাধ্যমে চিহ্নিত করে।

আদব ও আখলাকের ধারণা মানুষের আচরণ ও কথাবার্তার কাঠামো ঠিক করে দেয়। ইসলাম ঠিক করে দেয় লেনদেন ও ব্যবসার সীমানা। ইসলাম আমাদের বলে ইলম অর্জন ইবাদত, যা বুদ্ধিবৃত্তিক জগতকে নিয়ন্ত্রণ করে।

ইসলাম যাকাতের মাধ্যমে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করে। ধনীর সম্পদে গরিবের সুনির্দিষ্ট হকের কথা বলে। সাদাকাহর দানশীলতাকে অভ্যাসে পরিণত করে। 'ওয়াকফ'-এর মাধ্যমে হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরাইখানা, লাইব্রেরি, লঙ্গরখানা, দুস্থ মানুষের সাহায্যের মতো বিষয়গুলো পরিচালিত হয়ে এসেছে; যা যুগ যুগ ধরে সমাজই সমাজের জন্য টিকিয়ে রেখেছে। ইসলাম এমন সব প্র্যাকটিসকে নার্চার করে যা একটা সমান্তরাল জনমুখী অর্থনীতি গড়ে তোলে।

ইসলাম ইয়াতিমের পরিচর্যাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়—রাসূল ﷺ জান্নাতে নিজের এবং এতিম প্রতিপালনকারীর অবস্থানকে হাতের দুটি আঙুলের সাথে তুলনা করেছেন। মুসাফির বা আগন্তুকের প্রতি আতিথেয়তাকে দায়িত্ব হিসেবে অর্পণ করে। 'হাক্কুল ইবাদ' বা সৃষ্টির হকের ধারণার মাধ্যমে প্রাণিজগতের প্রতিও রাহমাহ এবং দায়িত্বের সীমাকে বিস্তৃত করে।

এটা এক অত্যন্ত কমপ্রিহেনসিভ সামাজিক নৈতিকতা। এটি আগে থেকে থাকা কোনো সংস্কৃতির ওপর চাপিয়ে দেওয়া একগুচ্ছ নিয়ম না; বরং এটা নিজেই একটা পূর্ণাঙ্গ সংস্কৃতি। মানব ইতিহাসের সবচেয়ে নিবিড়ভাবে সাজানো, সুসংহত এবং অভ্যন্তরীণভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ (internally coherent) সমাজব্যবস্থা।

'মুসলিমরা কালচার করবে কী করে?'—এই প্রশ্ন কেবল তখনই খাটে, যখন আপনি আগে থেকেই ঠিক করে নেন যে ওপরের কোনো কিছুই 'সংস্কৃতি'র আওতায় পড়ে না। কারণ এখানে উৎসব নেই, প্রদর্শন নেই।


৪.

যদি প্রদর্শন ও উৎসব নির্ভর সংজ্ঞাকেই মাপকাঠি ধরা হয়, তাহলে সবচেয়ে সমৃদ্ধ সংস্কৃতি হল পৌত্তলিক সংস্কৃতি। যেকোনো পৌত্তলিক সংস্কৃতি। পৌত্তলিকতার মধ্যে বছর জুড়ে নানা মওসুমের উৎসব থাকে, নাচ-গান, মদ-মাংস, অবাধ মেলামেশা, বিভিন্ন মিথ আর কল্পকাহিনী থাকে।

আধুনিক খ্রিষ্টবাদেরও—বিশেষ করে ক্যাথলিক এবং অর্থোডক্সদের অধিকাংশ উৎসব, অনুষ্ঠান এবং লিটার্জি পৌত্তলিক উৎস থেকে আসা। দেখবেন খ্রিষ্টবাদের এই দুই ধারার অনুষ্ঠানগুলো খুব জাকজমকপূর্ণ।

ইসলাম এই মাপকাঠিতে পিছিয়েই থাকবে, কারণ মহান আল্লাহ এই মাপকাঠিতে প্রতিযোগিতার জন্য ইসলামকে দেননি। ইসলামের সাংস্কৃতিক পুনরুৎপাদনের মূল পদ্ধতিগুলো হলো—অন্তর্মুখী, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং সামষ্টিক-কিন্তু-সুনির্দিষ্ট সীমার ভেতরে।

সালাত কোনো পারফরম্যান্স বা প্রদর্শনী না। মসজিদ কোনো উন্মুক্ত স্টেজ বা মঞ্চ না। রমাদ্বান মুসলিমের রুহানি, আমলী এবং ঘরোয়া জীবনকে বদলে দেয় ঠিকই, কিন্তু রাস্তায় কোনো তামাশা তৈরি করে না।

প্রদর্শনী এবং উৎসবের বিচারে পৌত্তলিক কিংবা আধুনিক জাতীয়তাবাদী নির্মিত সংস্কৃতি সবসময়ই ইসলামের চেয়ে বেশি সমৃদ্ধ মনে হবে। কারণ প্রদর্শনী বা দেখনদারিই সেইসব সংস্কৃতির মূল ভিত্তি।

লোকজ ধর্মের সুনির্দিষ্ট কোনো জ্ঞানতত্ত্ব (Epistemology) নেই, কোনো আইনব্যবস্থা নেই, নেই কোনো সভ্যতা নির্মাণের স্থাপত্য। তার আছে তা হলো—কিছু আচার, কিছু প্রতীক আর কিছু উৎসব। তার সাংস্কৃতিক বিনিয়োগের পুরোটাই এই দৃশ্যমান উপরিভাগে; কারণ এর গভীরে দেওয়ার মতো তার তেমন কিছু নেই।

জাতীয়তাবাদের মতো সেক্যুলার মতাদর্শগুলো যখন 'সংস্কৃতি' নির্মাণ করে তখনও সেটা একই রকম হয়ে দাঁড়ায়—প্যারেড, আনুষ্ঠানিক সঙ্গীত, পতাকা কিংবা কোনো পবিত্র চিহ্নকে সম্মান জানানো, কোনো 'প্রতিষ্ঠাতা মিথ' বা জনশ্রুতির রোমন্থন করা, আর আনুষ্ঠানিকতা শেষে অবাধ মেলামেশা এবং পানাহারের উৎসব।

এখানে প্রদর্শনীই হলো সারবস্তু।

ইসলামের যুক্তি ঠিক এর বিপরীত। ইসলামী সভ্যতা তার শক্তি ব্যয় করেছে সূক্ষ্ম ফিকহ এবং হাদীসশাস্ত্র নির্মাণে, শরীয়াহ ও ইসলামি জ্ঞানতত্ত্ব বিন্যাসে, এক পূর্ণাঙ্গ সামাজিক নৈতিকতা এবং নববী ঘরানা থেকে উৎসারিত এক রুহানী উৎকর্ষের পরম্পরা তৈরি করতে। ইসলামী সভ্যতা প্রদর্শন কিংবা উৎসব ম্যানুফ্যাকচার করার পেছনে শ্রম ব্যয় করেনি। তার সেটার প্রয়োজনও ছিল না।


৫.

সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের এই সংকীর্ণ সংজ্ঞার জায়গা থেকে অনেকে কাওয়ালী, আর নববর্ষ উদযাপনের 'ইসলামী কায়দা' তৈরি করার চেষ্টা করছেন।

তাদের যুক্তিটা অনেকটা এরকম: আমাদের জনজীবনে মুসলিম সংস্কৃতির একটা দৃশ্যমান উপস্থিতি দরকার। আমাদের এমন কিছু দরকার যা চোখে পড়বে, যা মানুষের আবেগকে নাড়া দেবে এবং যা হবে সহজে বোধগম্য।

মিলাদ, কাওয়ালি, মাজার সংস্কৃতি, শহীদ মিনারে ফাতিহা পাঠ, নববর্ষে মাদ্রাসা ছাত্রদের র‍্যালি—এগুলো মুসলিম উপস্থিতিকে দৃশ্যমান করবে, সহজে জনপ্রিয় হবে। এবং এসবের মধ্য দিয়ে জনপরিসরকে একটু হলেও দখলে রাখা যাবে, তা না হলে সব কিছু "শাহবাগী"দের দখলে যাবে।

আপনি যদি এসবের সমালোচনা করেন, তাহলে আপনাকে দেওয়া হবে 'পিউরিস্ট' বা 'ওয়াহাবি'-র তকমা। একজন সাংস্কৃতিক ফ্যাসিস্ট, যিনি মুসলিম জীবন থেকে সমস্ত আনন্দ আর রঙ মুছে ফেলতে চান।

এদের অনেকের নিয়্যাত ভালো বলেই মনে হয়। মুসলিমরা যদি দৃশ্যমান কোনো সামষ্টিক জীবন তৈরি করতে না পারে, তবে অন্য কিছু সেই জায়গাটা দখল করে নেবে। এই উদ্বেগটি বাস্তব। তবে সমস্যা হল, এটা ঘটমান বর্তমান না। এটা বহু দশক আগেই হয়ে গেছে।

যারা এই তরীকায় 'পাল্টা-সংস্কৃতি' তৈরি করার দিকে ঝুঁকেছেন, তারা দেখছেন সমাজ পাশ্চাত্য এবং হিন্দুয়ানী সংস্কৃতির দিকে ঝুঁকে পড়ছে, কনসার্ট আর ক্লাবের দিকে ছুটছে। মরিয়া হয়ে তারা এমন কিছু দিতে চান যা এর সাথে পাল্লা দিতে পারে।

কিন্তু নিয়্যাত ভালো হলেই কাজ শুদ্ধ হয় না। তারা যে ভুলটা করছেন তা হলো: তারা প্রতিপক্ষের দেওয়া সংস্কৃতির সংজ্ঞাটাকেই মেনে নিয়েছেন। বুঝে কিংবা না বুঝে, প্রতিপক্ষের তৈরি টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশান গ্রহণ করেছেন। তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সংস্কৃতির লড়াইয়ে জিততে হলে লড়তে হবে প্রদর্শনীর ময়দানে।

আর যখনই সেই ময়দানটা বেছে নিলেন, তখনই তারা হেরে গেলেন।

প্রথমত, এটা করতে গিয়ে তারা অনেক ক্ষেত্রেই ইসলামের বিভিন্ন বিধিবিধানকে ভাঙছেন। মানুষকে সেগুলো ভাঙতে এবং উপেক্ষা করতে উদ্বুদ্ধ করছেন। একজন মুসলিমের জন্য এটা অত্যন্ত গুরুতর একটা বিষয়।

দ্বিতীয়ত, তারা প্রতিযোগিতাতেও হারলেন এবং হারতেই থাকবেন। কারণ প্রদর্শনী সবসময় আরও বেশি তীব্রতা দাবি করে। এটা প্রতিনিয়ত নতুনত্ব, আবেগের উসকানি আর স্নায়বিক উত্তেজনা চায়। এটা এক ধরনের 'ডোপামিন ইকোনমি'।

আজকের পৃথিবী এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যেখানে মানুষের মনোযোগই প্রধান পণ্য এবং বিনোদনই একমাত্র উপজীব্য। যেখানে কনসার্ট, সিনেমা, রিলস আর সোশ্যাল মিডিয়া ফিড সবসময় আপনাকে আরও বেশি উত্তেজনা দেওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত।

এখানে 'কাওয়ালি সন্ধ্যা', চান রাতের গানবাজনার মাহফিল, কিংবা নববর্ষে 'মুসলমানী র‍্যালি' নেহায়েত দুর্বল বিকল্প এবং পরাজিত প্রতিদ্বন্দ্বী। কর্পোরেট হলিডে, বিনোদন ইন্ডাস্ট্রি এবং জাহেলি রীতি যা দিচ্ছে, এগুলো তার সাথে প্রতিযোগিতা করতে পারে না।

যেভাবে কফি কখনো কোকেইনের সাথে প্রতিযোগিতা করতে পারে না। কাওয়ালী কখনো কনসার্টকে টেক্কা দিতে পারে না। তাদের দুর্বল গানবাজনা কখনো আধুনিক পৃথিবীর শত রকমের মিউজিক্যাল জনরাকে ছাপিয়ে গিয়ে মানুষকে ইসলামমুখী করতে পারে না।

যে তরুণরা স্রেফ প্রদর্শনীর আকর্ষণে আসে, তারা সবসময়ই অন্য কোথাও আরও শক্তিশালী প্রদর্শনী খুঁজে পাবে। যারা মেয়ে দেখার জন্য আসে, তারা অন্য কোথাও মেয়ে খুঁজে পাবে। যারা ছুটির দিনে ঘুরতে বের হয় তারা আরও অনেক ছুটির দিন পাবে।

আর এসব 'সাংস্কৃতিক আয়োজনের' মাধ্যমে দ্বীনের দাওয়াহ করার কোনো চিন্তাভাবনা যদি কারো মাথায় থাকে তাহলে তারা বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন ভয়ঙ্কর একটা ডিলিউশানে আছেন।

যে কনসার্টে যায়, সে কাওয়ালী সন্ধ্যায় এসে কনসার্ট ছেড়ে দেয় না। কিন্তু যে কোনো দিন কনসার্টে যায়নি, কাওয়ালি সন্ধ্যায় যাওয়াআসার অভ্যাস হওয়ার পর সে কনসার্টে যাওয়া শুরু করে।

বাংলাদেশে একটা বিখ্যাত গানের লাইন ছিল—সিগারেট থেকে শুরু, শেষকালে হেরোইন। গতিপথটা সবসময় এমনই হয়। কেউ হেরোইন দিয়ে শুরু করে শেষকালে সিগারেট ধরে না।

কাজেই 'সংস্কৃতি নির্মাণের' এসব চেষ্টা সর্বোচ্চ জাহেলিয়াতের তৈরি ক্যাটাগরিগুলোর মধ্যে একটা ছোট নিশ বা পকেট হিসেবে থাকতে পারে।

অন্যদিকে এই ধরনের পারফর্মেটিভ মুসলমানিত্ব প্রকৃত পুনর্জাগরণের পথে বাধা তৈরি করে। কারণ সে জাহেলিয়াতকে চিহ্নিত করার বদলে তার আত্মীকরণের চেষ্টা করে। তাদের বয়ান মুসলিম সমাজকে সেই সভ্যতাসংকট ভুলিয়ে রাখে যা মানুষের মধ্যে পুনর্জাগরণের তাড়না তৈরি করে। এগুলো দীর্ঘমেয়াদে এক অ্যানেস্থেশিয়ার মতো কাজ করে, যা মুসলিম সমাজের আরোগ্য লাভের প্রয়োজনীয়তাকেই ভুলিয়ে দেয়।


৬.

এই সমস্যার গভীরে যেতে হলে একটা মৌলিক পার্থক্য বুঝতে হবে।

মুসলিম সংস্কৃতি বা ইসলামী সংস্কৃতি সংক্রান্ত আলোচনায় প্রথম পর্যায়ের শর্ত (First-order condition) এবং দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রভাব (Second-order effect)-এর মধ্যকার পার্থক্য বোঝা জরুরি।

প্রথম পর্যায়ের শর্ত হলো মূল কারণ; সেই শিকড় যেখান থেকে সবকিছু জন্ম নেয়। আর দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রভাব হলো তা, যা মূল লক্ষ্যবস্তু না হলেও সেই শিকড় থেকে প্রাকৃতিকভাবে বেরিয়ে আসে। সমাজ গঠন হল ফার্স্ট অর্ডার কন্ডিশান, যার ফলাফল হিসেবে সভ্যতার শক্তি, সাংস্কৃতিক উৎপাদন বা সংস্কৃতির দৃশ্যমান দিকগুলো উঠে আসে।

কিছু উদাহরণ চিন্তা করুন।

ডে কেয়ার সেন্টার এবং বৃদ্ধাশ্রম; এ দুটো প্রতিষ্ঠান ইউনিকলি আধুনিকতা ও পশ্চিমা সংস্কৃতির ফসল। এই প্রতিষ্ঠানগুলো কোন প্রেক্ষাপটে তৈরি হয়? এগুলো তৈরি হয় এমন সমাজে যেখানে পারিবারিক বন্ধন দুর্বল, যেখানে অধিকাংশ পরিবার নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির ফরম্যাটে চলে, যেখানে পিতামাতার প্রতি সম্মান ও দায়িত্ববোধ অনুপস্থিত এবং যে অর্থনীতিতে নারীরা ঘরের বাইরে গিয়ে কাজ করেন প্রয়োজন বা প্রচলনের কারণে। এই প্রেক্ষাপটেই ডে কেয়ার সেন্টার এবং বৃদ্ধাশ্রম শুধু তৈরি হয় না, বরং প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে।

আধুনিক ফেমিনিজম কোন ধরনের সমাজ ও সভ্যতায় সম্ভব? এমন সমাজ, সভ্যতা ও অর্থনীতিতে যেখানে অধিকাংশ চাকরি ডেস্ক জবে পরিণত হয়েছে, যেখানে যুদ্ধ এবং ভায়োলেন্সের সাথে সাধারণ জীবনের কিছুটা দূরত্ব বজায় থাকে, যেখানে রাষ্ট্র সরাসরি নাগরিকের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে ও এক ধরনের অভিভাবকের ভূমিকা নেয়, এবং যেখানে ব্যক্তি স্বাধীনতার খুব সুনির্দিষ্ট ধরনের একটা অর্থ আছে, যা বিশ্বাসে পরিণত হয়েছে।

বার এবং নাইটক্লাব কালচার কোন সমাজে গড়ে ওঠে? যে সমাজ মদপান, নারীপুরুষের অবাধ মেলামেশা বা যিনাকে খারাপ কিছু বলে মনে করে না। যেহেতু সে প্রয়োজনীয় মনে করে তাই এগুলো এফিশিয়েন্টলি হওয়ার মেকানিজম হিসেবে এই ধরনের প্রতিষ্ঠান এবং সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।

এবার উল্টো দিক থেকে চিন্তা করুন। সাহাবায়ে কেরাম রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম এবং সালাফুস সালিহিনের সময়ে এমন একাধিক ঘটনা আছে, যেখানে একজন ব্যবসায়ী ক্রেতাকে বলছেন, আমার কাছ থেকে না কিনে আমার পাশের বিক্রেতার কাছ থেকে কিনুন, তার এটা বেশি দরকার। এটা কোন সমাজে হয়? নিওলিবারেল অর্থনীতিতে, পুঁজিবাদী চিন্তার জায়গা থেকে তো এমন করা অযৌক্তিক। এই ধরনের আচরণ ঐ সমাজে দেখা যায়, যেখানে প্রতিযোগিতার বদলে ভ্রাতৃত্ববোধ গুরুত্ব পায়, যেখানে স্কারসিটি বা কম্পিটিশানের ধারণার বদলে রিযকদাতা হিসেবে মহান আল্লাহর ওপর ঈমান প্রাধান্য পায়, যেখানে মার্কেটের লজিকের বদলে অল্পতে সন্তুষ্ট হওয়া এবং হিসেবের টাইমলাইন হিসেবে শুধু দুনিয়া নয়, দুনিয়া এবং আখিরাত—দুটোকেই ফ্যাক্টর ইন করা হয়।

মুসলিম সভ্যতায় এমন সময় গেছে যখন পুরো মুসলিম ভূখণ্ডের এক-তৃতীয়াংশ ওয়াকফের অধীনস্থ ছিল। ওয়াকফের মাধ্যমে সরাইখানা, মাদ্রাসা, লাইব্রেরি, চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান, কূপ, পুকুর, রাস্তাসহ বিভিন্ন সামাজিক কল্যাণমূলক প্রকল্প চালু ছিল। এটা কোন সমাজে সম্ভব? যে সমাজে প্রকৃত তাকওয়া আর যুহদ চেতনা আছে, যে সমাজ আখিরাতের লাভকে তার হিসেবে ফ্যাক্টর ইন করে, সেখানেই উদ্বৃত্ত সম্পদ ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিলাসিতায় ব্যয় না হয়ে সামাজিক কল্যাণে ওয়াকফ এই মাত্রায় জমা হতে পারে।

উসমানীদের সময়ে রাস্তায় পাখি, বিড়ালের মতো প্রাণীদের জন্য খাবার ও পানির ব্যবস্থা থাকতো। এগুলোর কিছু শাসকের উদ্যোগে হতো, কিছু হতো কমিউনিটি উদ্যোগে ওয়াকফের মাধ্যমে। কেন হতো? কারণ এই সমাজ হাক্কুল ইবাদের ধারণাকে আত্মস্থ করেছে।

এমনকি আধুনিক শিল্পের বিভিন্ন ধারা-উপধারাও সুনির্দিষ্টভাবে এই সময়ের সভ্যতা ও সংস্কৃতির ফসল। আঠারো শতাব্দীর শেষভাগ থেকে উনিশ শতাব্দীর রোমান্টিক ধারা, পঞ্চাশের দশকের বিট জেনারেশন, ষাটের দশকের কাউন্টার কালচার, সত্তরের দশকের সিনেমায় আল্ট্রা ভায়োলেন্সের উত্থান, আশির দশকে হলিউডের এক্সট্রাভ্যাগেন্স, নব্বইয়ের দশকে গ্রাঞ্জ এবং নব্বইয়ের শেষ থেকে নতুন সহস্রাব্দের শুরু পর্যন্ত ন্যু মেটালের জনপ্রিয়তা, এবং আশির দশক থেকে বেড়ে ওঠা হিপহপ যা নতুন সহস্রাব্দে বৈশ্বিক মূলধারায় পরিণত হয়—এই সবগুলো সমাজ ও সভ্যতার ভেতরে চলা নানা প্রক্রিয়ার ফলাফল।

অর্থাৎ সমাজ, সভ্যতা, এগুলোর পেছনে থাকা বিশ্বাস ও মানুষের জীবনাচার হলো ফার্স্ট অর্ডার কন্ডিশান, যার কারণে সীমিত অর্থে যেটাকে সংস্কৃতি বলা হয়, তার অনেক উপাদান তৈরি হয়।

মুসলিম সংস্কৃতি সবসময় মুসলিম সমাজ ও সভ্যতার বাইপ্রোডাক্ট—সংস্কৃতির যে সংজ্ঞাই নেওয়া হোক না কেন। আন্দালুসিয়ার স্থাপত্য, মক্তব সংস্কৃতি, অটোমান ক্যালিগ্রাফি কিংবা 'ইসলামি স্বর্ণযুগের' সাহিত্য—এর কোনোটাই এমন কোনো সমাজের ফসল ছিল না যারা স্রেফ এবং সচেতনভাবে 'ইসলামি সংস্কৃতি উৎপাদন' করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এগুলো ছিল এমন এক সমাজের ফসল যেখানে ইসলাম জীবন্ত ছিল। ইসলাম এবং এর শিক্ষা মানুষের জীবনের সাথে মিশে ছিল। সভ্যতার বাস্তবতায় বিদ্যমান ছিল। সংস্কৃতি সেই জীবনের ওভারফ্লো, কোনো পরিকল্পিত প্রজেক্ট না।

তাই মুসলিম কিংবা ইসলামী সংস্কৃতি চাইলে আগে প্রকৃত অর্থে ইসলামের শিক্ষাগুলো সমাজে জীবন্ত করতে হবে। আপনি ফার্স্ট অর্ডার কন্ডিশানকে অবহেলা করে কখনোই সেকেন্ড অর্ডার ইফেক্ট অর্জন করতে পারবেন না। মরা গাছে প্লাস্টিকের পাতা ঝুলিয়ে দিলে, সেই গাছ থেকে ফুল কিংবা ফল পাওয়া যাবে না।


৭.

মুসলিম সংস্কৃতি বা 'ইসলামী সংস্কৃতি' কী হবে, কেমন হবে; এ প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার আগে সংস্কৃতি বলতে ঠিক কী বোঝানো হচ্ছে সেটা বোঝা দরকার। উৎসব, উদযাপন, প্রদর্শনী, গান, নাচ, মেলা-কেন্দ্রিক সংস্কৃতির যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়, সেটা রিডাকটিভ এবং খণ্ডিত। সংস্কৃতির আরো ব্যাপক ও কার্যকর সংজ্ঞা হলো: সংস্কৃতি হলো সেই সামগ্রিক জীবনাচার, যার মাধ্যমে একটি সমাজ তার মূল্যবোধ, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং অস্তিত্বের দিশাকে পুনরুৎপাদন করে।

এই অর্থে ইসলামের নিবিড়ভাবে সাজানো, সুসংহত এবং অভ্যন্তরীণভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ (internally coherent) সমাজব্যবস্থা এবং পূর্ণাঙ্গ সংস্কৃতি আছে। কিন্তু প্রদর্শন ও উৎসব নির্ভর মাপকাঠিতে ইসলাম পিছিয়েই থাকবে, পৌত্তলিক সংস্কৃতি এগিয়ে থাকবে।

অলরেডি এক্সিস্টিং বিভিন্ন জাহেলি দিন বা উৎসবের 'মুসলমানীকরণ' একটা ব্যর্থ এবং ক্ষতিকর অ্যাপ্রোচ। এর ফলে জাহেলিয়াতের স্বাভাবিককরণ আর মুসলিমদের জাহেলিয়াতের দিকে পিছলে যাওয়ার বাইরে ইসলামের মাপকাঠিতে আর তেমন কোনো অর্জন আসবে না।

প্রকৃত মুসলিম সংস্কৃতি ঐ সমাজ থেকে স্বাভাবিকভাবেই বের হয়ে আসবে যে সমাজ ইসলামকে আত্মস্থ করেছে, নিজের মধ্যে ধারণ করেছে, এবং সামগ্রিকভাবে ইসলামকে পালনের চেষ্টা করছে। ইসলামী সমাজ হলো ফার্স্ট অর্ডার কন্ডিশান, সংস্কৃতি সেটার সেকেন্ড অর্ডার ইফেক্ট। সংস্কৃতি আলাদা করে জুড়ে দেওয়া কিছু না। বরং ইসলামি জীবনাচার ও সমাজের স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক ফসল।

হাদীসে জিবরীলে (আলাইহিসসালাম) বর্ণিত শিক্ষার আলোকে বিচার করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে মানুষের বিশাল অংশ ইসলামের প্রথম স্তরটাও সঠিকভাবে পালন করে না। আর যাদের দ্বীনদার শ্রেণী ভাবা হয় তারা ইসলামের বাহ্যিক রূপগুলো পালন করছেন ঠিকই, কিন্তু নিজের জীবন, আচরণ, লেনদেন, আল্লাহর ও মাখলুকের হক রক্ষা করার ক্ষেত্রে খুব অল্প মানুষই শরীয়াহ ও সুন্নাহর আদলে নিজেদের পরিচালিত করছেন।

এর বদলে নিওলিবারেল ভোগবাদ, হাজার বছরের পৌত্তলিকদের পাশাপাশি থাকার কারণে তাদের সমাজ ও সংস্কৃতির আত্মীকরণ, বিভিন্ন ধরনের আঞ্চলিক প্রবণতা, দ্বীনের মেজাজের বদলে রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীস্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া, নিজের নফসের সিদ্ধান্তকে দ্বীনের মোড়কে জায়েজ করার প্রবণতা—এগুলোই মনস্তত্ত্ব ও আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করছে।

যে সমাজ সুন্নাহর দৃষ্টান্ত, শরীয়াহর মেজাজ এবং ইসলামের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিকে বাদ দিয়ে কেবলই বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতার স্তরে থাকে, সেখানে কেবল খোলসটা থাকে, ভেতরটা হয় ফাঁপা। সেই রূপান্তরকারী শক্তি থাকে না যা ইসলামী নিযাম এবং ইসলামী সভ্যতার জন্ম দিতে পারে। তারচেয়ে বড় কথা, দ্বীনদার বলে পরিচিত শ্রেণী যখন ইসলামের আদর্শ ও মাপকাঠির দৃষ্টান্ত হওয়ার বদলে বিভিন্ন পদস্খলন বা অপরাধে জড়িয়ে যায়, তখন সেটা ইসলামী দাওয়াহকে দুর্বল করে।

এই অবস্থান থেকে কোনো সাংস্কৃতিক জাগরণ সম্ভব না।

উৎসব, উদযাপন, প্রদর্শনী ম্যানুফ্যাকচার করা যায়। কিন্তু প্রকৃত অর্থে সংস্কৃতিকে ম্যানুফ্যাকচার করা যায় না। সংস্কৃতি আপনার সমাজ, সত্তা ও জীবনাচারের ওভারফ্লো। আর আপনার ভেতরে যা আছে, আলটিমেটলি সেটাই বের হয়ে আসবে।

আমাদের সামনে দুই ধরনের ব্যর্থতা আছে। প্রথম সমস্যা হলো, প্রদর্শনবাদী সংজ্ঞাকে মেনে নিয়ে 'ইসলামি সাংস্কৃতিক কন্টেন্ট' তৈরির চেষ্টা। দ্বিতীয় সমস্যা হলো, যারা নিজেদের দ্বীনদার বলছেন তারা যথাযথভাবে সামগ্রিক অর্থে দ্বীনকে পালন ও ধারণ না করা। এবং এর ফলে সমাজের সামনে সঠিক দৃষ্টান্ত এবং শিক্ষা তুলে ধরার ক্ষেত্রে ব্যর্থতা।

সমাধান হলো অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে প্রথম পর্যায়ের শর্তসমূহ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা এবং ধৈর্য ধরে দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রভাবগুলো ফুটে ওঠার অপেক্ষা করা। এই পথ নতুন কোনো পথ না। যুগে যুগে যারা বিভিন্ন সময় ও স্থানে দিশেহারা উম্মাহ ও কওমকে আবার সিরাতুল মুস্তাকীমে ফিরিয়ে এনেছেন বা আনার চেষ্টা করেছেন, তাঁরা এই পথেই হেঁটেছেন। তাঁরা কাজ করেছেন শরীয়াহর সীমানার ভেতরে থেকে, তাকওয়াকে ভিত্তি বানিয়ে, নিজ সময়ের ও স্থানের বাস্তবতাকে উপলব্ধি করে। তারা কখনো বলেননি পরিস্থিতি সংকটজনক তাই শরীয়াহ এক পাশে রাখতে হবে। বরং তারা বুঝেছিলেন, শরীয়াহর বাইরে কোনো পথ নেই, কেবল গন্তব্যহীন বিশৃঙ্খলা আছে।

মুসলিম সংস্কৃতি নির্মাণের প্রকল্প আর তাজদীদ বা ইসলামী পুনর্জাগরণের প্রকল্প আসলে একই। সমাজে দ্বীনের পুনর্জাগরণ না হলে সংস্কৃতি গড়ে উঠবে না।

তাই প্রশ্ন এটা না যে মুসলিমরা কোন সাংস্কৃতিক বিকল্প তৈরি করবে।

প্রশ্ন হলো—মুসলিমরা কি সেই কঠোর ও দীর্ঘ পরিশ্রম করতে রাজি আছে, যা যেকোনো প্রকৃত বিকল্পকে সম্ভব করে তোলে?